এআইয়ের পথে বাংলাদেশ: ডেটা, ক্লাউড আর প্রস্তুতির বাস্তব হিসাব

Staff Reporter৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
এআইয়ের পথে বাংলাদেশ: ডেটা, ক্লাউড আর প্রস্তুতির বাস্তব হিসাব

বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ঢুকে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর যুগে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এআইয়ের অবদান হতে পারে ১৫ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি = এক ট্রিলিয়ন) ডলারের বেশি। এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর, যারা প্রযুক্তি গ্রহণে পিছিয়ে পড়লে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বড় ব্যবধানে হারিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। এআই কি আমাদের জন্য কেবল একটি ‘ফ্যাশন’ শব্দ থাকবে, নাকি উৎপাদনশীলতা, সেবা ও শাসনব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করছে কিছু কঠিন বাস্তব সিদ্ধান্তের ওপর।

কেন এআই বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমঘন খাতনির্ভরতা বেশি। সে তুলনায় উৎপাদনশীলতা কম। সেবা খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এআই এখানে দুটি জায়গায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে—উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সীমিত সম্পদ দিয়ে বেশি সেবা প্রদান করতে পারবে।

এআই সরকারি সেবায় সময় ও খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। কৃষিতে ফলন পূর্বাভাস ও রোগ শনাক্তকরণে ক্ষতি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণে দক্ষতা ৩০ থেকে ৪০% বাড়তে পারে। এই সুবিধা পেতে হলে এআই শুধু আমদানি করলে হবে না, দেশীয় বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে হবে।

ডেটা: পরিমাণ আছে, প্রস্তুতি নেই

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৮ কোটির বেশি জাতীয় পরিচয়পত্র রেকর্ড রয়েছে। আছে ১৭ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ। ৭ কোটির বেশি মোবাইল আর্থিক লেনদেন সেবা ব্যবহারকারী রয়েছে। এ ছাড়া আছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় কোটি কোটি রেকর্ড। সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশাল শক্তি। কিন্তু এআইয়ের জন্য প্রয়োজন ব্যবহারযোগ্য ডেটা নেই।

ডেটা সমস্যার ৩টি পরিসংখ্যানভিত্তিক দিক—১. বিচ্ছিন্নতা: সরকারি ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো সাইলোভিত্তিক, মানে বিচ্ছিন্ন। এক মন্ত্রণালয়ের ডেটা অন্যান্য মন্ত্রণালয় ব্যবহার করতে পারে না। একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি ডেটার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ একাধিক দপ্তরের সঙ্গে আন্তসংযুক্ত নয়। ২. মান ও হালনাগাদ: অনেক ডেটাসেট নিয়মিত হালনাগাদ হয় না। ফলে এআই মডেলের পূর্বাভাস বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। ৩. ডেটা গভর্ন্যান্স ঘাটতি: ডেটা ব্যবহারের স্পষ্ট আইনি কাঠামো না থাকলে এআই প্রয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের ডেটা প্রস্তুতি

ক্লাউড ও কম্পিউটিং: এআইয়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ। বিশ্বব্যাপী এআই উন্নয়নের বড় বাধা হলো কম্পিউটিং খরচ।

একটি মাঝারি আকারের এআই মডেল প্রশিক্ষণে প্রয়োজন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জিপিইউ (গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট)। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ ও কুলিং (প্রসেসরকে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা)। স্কেলযোগ্য ক্লাউড অবকাঠামো।

বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশে জাতীয় ডেটা সেন্টার রয়েছে। কিছু বেসরকারি ডেটা সেন্টার গড়ে উঠছে। কিন্তু এআই মানের জিপিইউ অবকাঠামো সীমিত।

ফলে বড় এআই প্রকল্পে এখনো বিদেশি ক্লাউডের ওপর নির্ভর। খরচ তুলনামূলক বেশি। ডেটার সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে।

এআই কম্পিউটিং–নির্ভরতা

এআইয়ের বেলায় দেশীয় অবকাঠামো কমবেশি ৩০ শতাংশ ও বিদেশি ক্লাউড কমবেশি ৭০ শতাংশ। মানবসম্পদ সংখ্যায় অনেক, কিন্তু দক্ষতায় ঘাটতি। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি স্নাতক পাস করেন। হাজারের বেশি প্রযুক্তি স্টার্টআপ সক্রিয়। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে, বাস্তব সমস্যায় দক্ষ এআই প্রকৌশলীর সংখ্যা খুব সীমিত। উন্নত গবেষণা সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ এআই জনবল ৪–৫ গুণ কম। অর্থাৎ এআই মানবসম্পদ চাহিদা ১০০, কিন্তু আছে ২০–২৫ জন। নীতি ও নিয়ন্ত্রণ সংখ্যার বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। ইউরোপে ঝুঁকিভিত্তিক এআই আইন প্রণীত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে খাতভিত্তিক গাইডলাইন তৈরি হয়েছে। এশিয়ায় জাতীয় এআই কৌশল প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ এআই পলিসি বা নীতিমালা নেই। ডেটা সুরক্ষা আইন বাস্তব প্রয়োগের অপেক্ষায়। সরকারি ব্যবহারে এআইয়ের নৈতিক নির্দেশনা স্পষ্ট নয়। পূর্ণাঙ্গ পলিসি ছাড়া এআই মানে নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি, যার খেসারত দিতে হয় নাগরিককে।

কোথায় দ্রুত সুফল মিলতে পারে

কৃষি খাতে ক্ষতি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং দক্ষতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পূর্বাভাসের সময় বাড়ানো সম্ভব। সড়কে যানজটের সময় ১৫–২০ শতাংশ কমানো সম্ভব।

সংখ্যাই গল্প বলে

এআই নিয়ে আলোচনায় আবেগ যতটা আছে, সংখ্যা তার চেয়েও বেশি কথা বলে। সংখ্যা বলছে, ডেটা আছে কিন্তু প্রস্তুত নয়। আগ্রহ আছে, কিন্তু অবকাঠামো সীমিত। জনবল আছে, কিন্তু দক্ষতা অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ আছে, কিন্তু এই সুযোগের জানালা চিরকাল খোলা থাকবে না। এআইয়ের পথে বাংলাদেশেরও হাঁটা শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন আমরা কি কৌশল, সংখ্যা আর বাস্তব হিসাব নিয়ে হাঁটছি?

Share this article